আশির দশকের প্রথম দিকে স্টিভ জবসের ডিজাইনে এবং তাঁর মেয়ের নামানুসারে বাজারে আসে ‘অ্যাপল লিসা’ নামক কম্পিউটার। এটি ছিল গ্রাফিকাল ইউজার ইন্টারফেস সুবিধার প্রথম কম্পিউটার যাতে প্রথম বারের মতো আইকন ছাড়াও ছিল মাউস নিয়ন্ত্রিত কার্সর ব্যবহারের সুবিধা। সে সময় মডেলটির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১০ হাজার মার্কিন ডলার। নতুন সুযোগ সুবিধা থাকা সত্ত্বেও বেশি দামের কারণে অ্যাপল লিসা শেষ পর্যন্ত বাজারে টিকে থাকতে ব্যর্থ হয়। তবে অ্যাপল সবচেয়ে বড় নাটকীয় ঘটনার সম্মুখীন হয় ১৯৮৩ সালে মাত্র দুই বছর আগেও বহুগুণে পিছিয়ে থাকা আইবিএম এ সময় অ্যাপলকে ছাড়িয়ে যায়। তখনকার ফর্টুনের এক জরিপ অনুযায়ী ৫৬ শতাংশ আমেরিকান কোম্পানি ব্যবহার করত আইবিএম পিসি যেখানে অ্যাপলের ব্যবহারকারী ছিল মাত্র ১৬ শতাংশ। একই বছর স্টিভ জবস এবং বিল গেটসও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়ে পড়েন।

তবে অ্যাপলের জন্য কিছুটা স্বস্তির সংবাদ আসে পরের বছর অর্থাৎ ১৯৮৪ সালে। ঐ বছর বাজারে আসা সাশ্রয়ী দাম ও সহজ ব্যবহার সুবিধাসম্পন্ন ম্যাকিনটোশ কম্পিউটার অ্যাপলকে জনপ্রিয় করে তোলে। তবে একই সময় মাইক্রোসফট নিজস্ব উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম বাজারে নিয়ে আসলে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হয়। অ্যাপল। এভাবে নানা ঘটনা দুর্ঘটনায় ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সালের মাঝামাঝি সময়ে অ্যাপলের কম্পিউটার বাজার হ্রাস পায়। ফলে কম্পিউটার ছাড়াও আরো নানা ধরণের প্রযুক্তি পণ্য বাজারে নিয়ে আসে অ্যাপল। এর মধ্যে রয়েছে ডিজিটাল ক্যামেরা, ভিডিও গেম কনসোল ইত্যাদি। এমনকি পোশাক ব্যবসায়ও শুরু করেছিল কোম্পানিটি। ১৯৮৫ সালে অ্যাপল সিইও এর পদ থেকে পদত্যাগ করেন স্টিভ জবস।
“আপনাকেও পৃথিবী ছেড়ে যেতে হবে, এমন চিন্তাই কেবল পাারে কোন কিছু হারানোর দুশ্চিন্তা থেকে আপনাকে রক্ষা করতে” – স্টিভ জবস।

১৯৮৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি অ্যাপল নিবন্ধিত হয় Apple.com নামে। এভাবে এক এক করে কেটে যায় অ্যাপলের ঘটনাবহুল সময়গুলো। ১৯৯১ সালে এসে অ্যাপল ব্যবসায়িক স্বার্থে কোম্পানিটির দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী আইবিএম এবং মটোরোলার সাথে মিলিত হয়ে AIM জোট গঠন করে। আইবিএম, মটোরালার হার্ডওয়্যার এবং অ্যাপলের সফটওয়্যার ব্যবহার করে PReP নামক নতুন কম্পিউটিং প্লাটফর্মের বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনাই ছিল এই জোটের মূল লক্ষ্য।
১৯৯৬ সালের শেষ দিকে নেক্সটকে ৪২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিময়ে কিনে নেয় অ্যাপল। তখন নেক্সটের সাথে স্টিভ জবসের সম্পৃক্ততা থাকায় ১৯৯৭ সালে অ্যাপলে প্রত্যাবর্তন করেন জবস। তিনি অ্যাপলে ফিরে আসলে তাকে অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তখন অত্যন্ত খারাপ সময় পার করছিল প্রতিষ্ঠানটি। এরকম একটা সময়ে মাইক্রোসফট কোম্পানিটিতে ১৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করলে কিছুটা স্বস্তি খুঁজে পায় অ্যাপল। বিনিয়োগ গ্রহণের পাশাপাশি ১৯৯৭ সালের শেষের দিকে অ্যাপল স্টোর চালু করে কোম্পানিটি। এর পরের বছর অর্থাৎ ১৯৯৮ সালের মার্চে স্টিভ জবস অ্যাপলকে পুনরায় লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিণত করতে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নিউটন, সাইবারডগ এবং ওপেনডগের মতো কিছু প্রকল্প বন্ধ করে দেয়া। পাশাপাশি অ্যাপল কম্পিউটারের নামের প্রথমে ইংরেজ আই (I) বর্ণ যুক্ত করা হয়। সেসময় বাজারে আসা অ্যাপল কম্পিউটারটির নাম দেয়া হয় ‘আইম্যাক’। খুব সহজেই এই কম্পিউটার দিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করা যাবে এরকমটা বোঝাতেই ইন্টারনেটের প্রথম বর্ণ ‘আই’ দিয়ে কম্পিউটারটির নাম রাখা হয় ‘আইম্যাক’। এই একই সূত্রের উপর ভিত্তিকরে পরবর্তীতে নাম আসে আইফোন ও আইপ্যাডের। ২০০০ সালের পর স্টিভ জবস প্রতিষ্ঠানটির পণ্য পরিকল্পনায় ব্যাপক পরিবর্তন আনেন এবং কম্পিউটারের পাশাপাশি আরো কিছু ইলেকট্রনিক ডিভাইস তৈরি শুরু করেন। প্রথমদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ২০০৩ সালে এসে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বিভিন্ন দেশে চালু হতে থাকে অ্যাপল স্টোর।

২০০৪ সালে পুরোপুরি মোড় ঘুরে যায় অ্যাপলের। মজবুত আর্থিক অবস্থার উপর দাঁড়িয়ে অতি অল্প সময়ে নতুন নতুন ডিজাইনের পণ্য তৈরি শুরু করে কোম্পানিটি। এরই সঙ্গে শুরু হয় অ্যাপলের জয়যাত্রা। বহনযোগ্য মিউজিক প্লেয়ার-আইপড, আইটিউনস, ডিজিটাল মিউজিক সফটওয়্যার এবং আইটিউনস স্টোর চালু করার মাধ্যমে অ্যাপল ইলেকট্রনিক্স ভোক্তা এবং সংগীত বিপণন বাজারে হানা দেয়। ২০০৭ সালের ২৭ জুন ‘আইফোন’ অবমুক্ত করার মাধ্যমে অ্যাপল সেলুলার ফোন ব্যবসায় শুরু করে। হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার এবং সেবার মান বৃদ্ধির জন্য ২০১২ সালের ২৯ অক্টোবর কোম্পানটিতে কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়। এর মাত্র আড়াই বছরের মাথায় ২০১৫ সালের শুরুর দিকে অ্যাপল প্রথম ৭০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের কোম্পানিতে পরিণত হয় এবং এর পরপরই গুগলকে অতিক্রম করে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান ব্র্যান্ড হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে অ্যাপল।

এই আর্টিকেলের প্রথম অংশ পড়ুনঃ https://millionairex101.com/success-story/%e0%a6%85%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%b2-%e0%a6%95%e0%a7%8b%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a6%ab%e0%a6%b2%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%b0/

তথ্যসূত্রঃ মোঃ শফিকুল ইসলামের বই “অগ্রযাত্রী” থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।

One thought on “অ্যাপল কোম্পানির সফলতার পেছনের অজানা গল্প! পর্ব-২”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *