অ্যাপল থেকে পদত্যাগের পর ঐ বছরই ৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিময়ে নেক্সট ইনকর্পোরেটেড নামে আরেকটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন স্টিভ জবস। তবে এক বছর পর্যন্ত তার কোনো পণ্য না থাকায় এবং ভীষণ অর্থ সংকটের কারণে তাকে বিনিয়োগকারীদের শরনাপন্ন হতে হয়। এ সময় তিনি বিলিয়নিয়ার রস পেরটের মনোযোগ আকর্ষণ করলে তিনি কোম্পানিটিতে প্রচুর পরিমাণে অর্থ বিনিয়োগ করেন। এর ফলে ১৯৯০ সালে নেক্সট ওয়ার্কস্টেশন অবমুক্ত করতে সক্ষম হন জবস। এটির তৎকালীন বাজারমূল্য ছিল ৯,৯৯৯ মার্কিন ডলার।

পরবর্তীতে অ্যাপল, নেক্সটকে কিনে নিলে ১৯৯৭ সালে আবার অ্যাপলে ফিরে এসে অ্যাপলকে দাঁড় করান স্টিভ জবস। এ সময় অ্যাপলের আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে তা দেখে ডেলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মাইকেল ডেল বলেছিলেন, তিনি যদি স্টিভ জবস এর জায়গায় থাকতেন তাহলে অ্যাপল বন্ধ করে শেয়ার হোল্ডারদের অর্থ ফেরত দিয়ে দিতেন। কিন্তু এমন অবস্থায়ও ভেঙে না পড়ে দৃঢ় হাতে সমস্ত পরিস্থিতি মোকাবেলা করেন জবস। তিনি অ্যাপলকর্মীদের জন্য উন্নত খাবার, ক্যাফের ব্যবস্থা ছাড়াও বেশকিছু সুযোগ সুবিধা চালু করেন।

পাশাপাশি তিনি প্রতিষ্ঠানটির পণ্য পরিকল্পনায় ব্যাপক পরিবর্তন আনেন এবং অ্যাপলকে একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। জবসের একটি বড় বাহাদুরী ছিল যে তিনি তার কোম্পানিতে কর্মী ধরে রাখতে পারতেন। তখনকার সময়ে অ্যাপল ত্যাগ করা কর্মীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৩%, যা সবচেয়ে কম। এমন প্রায়ই দেখা যেত যে, তার কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যে কেউ কেউ তার সাথে অপ্রীতিকর আচরণ করলেও জবস তার কোম্পানিতে নিয়োগকৃত কর্মী, ইঞ্জিনিয়ারদের ব্যবহারে হতাশ হতেন না। তিনি চাকরি থেকে কর্মীদের বরখাস্ত করাও অপছন্দ করতেন। এ বিষয়ে জবস বলেন, “আমি মনে করি এটা হয়তো আমিও হতে পারতাম যে বাড়ি গিয়ে স্ত্রী সন্তানকে বলছে আমাকে চাকরী থেকে অপসারণ করা হয়েছে। অথবা ২০ বছর পর হয়তো এটা আমার সন্তানের ক্ষেত্রেও হতে পারে।”

২০০০ সালে ম্যাকওয়ার্ল্ড আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে জবস দাপ্তরিকভাবে তার পদ থেকে অর্ন্তবর্তীকালীন শব্দটি উঠিয়ে দেন এবং অ্যাপলের স্থায়ী প্রধান নির্বাহীতে পরিণত হন। কম্পিউটার জগতের অন্যান্যদের সঙ্গে জবসের পার্থক্য হচ্ছে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিশ্চুপ থাকার স্বভাব আর কাজের মাধ্যমে অন্যদের জবাব দেয়া। নিশ্চুপ জবসের মাথায় সব সময় নতুন নতুন প্রযুক্তি খেলা করত। অ্যাপলে তার নেতৃত্বেই দূরদর্শী পণ্য হিসেবে যোগ হয় পাওয়ার ম্যাক, আইম্যাক, ম্যাকবুক এবং সর্বশেষ বাজার ছাপানো আইপ্যাড অন্যান্য কোম্পানি যখন ব্যবসায়িক লড়াই চালানোর জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল কম্পিউটার তৈরী করার চিন্তা করত, জবস তখন উচ্চলাভের প্রত্যাশা বাদ দিয়ে চিন্তা করতেন “সবার জন্য কম্পিউটার।”
” আমি মনে করি, আপনি যদি কোন কাজ করেন এবং সেটি যদি সত্যিই ভালো কিছু হয় তাহলে আপনার উচিত হবে আরও দারুন কিছু করার জন্য কাজ শুরু করে দেওয়া” ——–স্টিভ জবস। 

প্রযুক্তি জগৎকে যিনি একসময় নেতৃত্ব দিয়েছেন তার ব্যক্তিগত জীবন ছিল প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির এক অদ্ভুত মিশেল। স্টিভ জবসের বোন শোনা সিম্পসন আশির দশকের একজন প্রসিদ্ধ লেখিকা ছিলেন। পরবর্তী জীবনে জবস আপন বোন ও মাকে একত্র করতে পারলেও কখনোই তাঁর প্রকৃত বাবাকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি। জবস ১৯৯১ সালে লরেন পাওয়েলকে বিয়ে করেন। এই দম্পতির এক ছেলে ও দুই মেয়ে আছে। তরুণ বয়সে জবসের বান্ধবীর ঘরে আছে তার আরেকটি মেয়ে। জবস অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী হিসেবে বছরে মাত্র ১ মার্কিন ডলার বেতন গ্রহণ করতেন। অবশ্য তার কাছে অ্যাপল ও ডিজনির মোট ৬.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের শেয়ার ছিল। অর্থাভাবে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাওয়া সেই ছেলেটিই মৃত্যুর আগে হয়েছিলেন ৮.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মালিক, যুক্তরাষ্ট্রের ৪২ তম ধনী ব্যক্তি।
একক ও যৌথভাবে ৩৪২ টি পণ্যের পেটেন্ট ছিল তাঁর। যেকোন সময় মরে যেতে পারি- এ চিন্তাই আমাকে জীবনের বড় বড় সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছে” —স্টিভ জবস।

২০০৩ সালে জবসের শরীরে টিউমার ধরা পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্রোপচার না করায় বিপজ্জনক দিকে মোড় নেয় সেটি। তবে অস্ত্রোপচারের পর তিনি বেশ সুস্থ হয়ে ওঠেন। ২০০৮ সাল থেকে আবারও স্বাস্থ্য ভাঙতে শুরু করে জবসের। ওজন কমে গিয়ে রোগা হয়ে পড়েন তিনি। ২০১১ সালের ১৭ জানুয়ারিতে স্বাস্থ্যগত কারণে দ্বিতীয়বারের মতো ছুটিতে যান ৫৬ বছর বয়সী জবস। ছুটিতে থাকলেও অ্যাপলের সব খুঁটিনাটি বিষয়ে খেয়াল রাখতেন তিনি। বিশেষজ্ঞরা তাঁর বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন— তিনি ছিলেন এমন একজন কাজ পাগল লোক যে কিনা কাজ ছাড়া থাকতে পারে না। ২০১১ সালের আগস্টে জবস অ্যাপলের প্রধান নির্বাহীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তবে তিনি এ সময় কোম্পানির পরিচালনা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে বহাল ছিলেন। তিনি তার পদত্যাগ ঘোষণা দিলে কয়েক ঘন্টার মধ্যেই শেয়ার বাজারে অ্যাপলের পাঁচ শতাংশ দরপতন ঘটে। এটাই প্রমাণ করে অ্যাপলে স্টিভ জবসের অপরিহার্যতা।

তবে পার্থিব প্রয়োজনীয়তার মায়াজাল তো আর মানুষকে অমোঘ নিয়তির হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে পারেনা। জবসও পারেননি চিরন্তন এই নিয়মকে অস্বীকার করতে। অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ২০১১ সালের ৫ অক্টোবর পরপারে পাড়ি জমান অ্যাপলের জন্মদাতা। জবস তার ভালোবাসার কাজকে খুঁজে পেয়েছিলেন। সেই কাজকে অবলম্বন করেই তিনি পরবর্তী জীবনে হয়েছিলেন বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি। হয়ত তাই জীবন সায়াহ্নে প্রযুক্তির রাজপুত্রের শেষ উচ্চারিত শব্দটি ছিল ওয়াও— ওয়াও।

এই আর্টিকেলের প্রথম অংশ পড়ুনঃ https://millionairex101.com/success-story/%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%9f%e0%a6%bf%e0%a6%ad-%e0%a6%9c%e0%a6%ac%e0%a6%b8-%e0%a6%8f%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a6%ab%e0%a6%b2%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%aa%e0%a7%87%e0%a6%9b%e0%a6%a8%e0%a7%87/

তথ্যসূত্রঃ মোঃ শফিকুল ইসলামের বই “অগ্রযাত্রী” থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।

 

One thought on “স্টিভ জবস এর সফলতার পেছনের অজানা গল্প! পর্ব-২”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *