শিল্প খাতে বিশেষ করে গাড়ি শিল্পে ফোর্ডের নাম কে না জানে? এমন এক উদ্যমী মানুষের হাত ধরে এই প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করেছিল যিনি ছিলেন গাড়ি ব্যবসায়ের উদ্ভাবক এবং এ খাতে প্রথম উদ্যোক্তা। ব্যক্তিগত গাড়ি তৈরী করেও যে ব্যবসায় করা যায় এই ধারণা প্রথম তিনিই দিয়েছিলেন। এভাবে ‘সবার জন্য গাড়ি’ এই স্বপ্ন প্রথম যিনি দেখেছিলেন তিনি হলেন সর্বকালের সেরা উদ্যোক্তাদের একজন হেনরি ফোর্ড।

হেনরি ফোর্ডের জন্ম ১৮৬৩ সালের ৩০ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অন্তর্গত ডিয়ারবর্ণের এক খামার বাড়িতে। তার মায়ের নান মেরি ফোর্ড এবং বাবা উইলিয়াম ফোর্ড। হেনরি ফোর্ডের বাবা ছিলেন একজন কৃষক। অনেকে মনে করেন হেনরি ফোর্ডের বাবা মা অত্যন্ত গরিব ছিলেন। এ কারণে তার প্রথম জীবনও ছিল অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু এ তথ্য সঠিক নয়। যদিও তারা ধনী ছিলেন না, তবে একথাও ঠিক যে তারা অতি দরিদ্রও নন।

হেনরি ফোর্ড যখন ছোট ছিলেন তখন খামারগুলোতে প্রচুর কষ্টসাধ্য কায়িক শ্রমই ছিল ফসল উৎপাদনের একমাত্র পন্থা। এটা দেখে সেই ছোট বেলায়ই তিনি ধারণা করতেন যে এর চেয়েও ভালো কোনো উপায়ে অনেক বেশি কাজ করা যেতে পারে। এভাবে সমস্যা-সম্ভাবনা নিয়ে চিন্তা করার ক্ষমতা, বিশ্লেষণী মনোভাব তাকে পরবর্তীতে মেকানিক হতে প্রভাবিত করে। তাছাড়া ছোটবেলায় আজকালকার বাচ্চাদের মত খেলনা সামগ্রীও তার ছিল না। বরং তার ছিল ছোটোখাটো ধাতব যন্ত্রাংশের একটি ওয়ার্কশপ। ওয়ার্কশপের সেই সমস্ত ধাতব যন্ত্রাংশই ছিল তার কাছে খেলনার মত। আর মেশিনপত্রের প্রতিটি ভাঙা টুকরো ছিল তার কাছে এক একটি সম্পদ। ছোটবেলায় তার এই কাজকর্ম দেখে তার মা তাকে বলত হেনরি মেকানিক হয়েই জন্মেছে।

পাঁচ বছর বয়সে ফোর্ড স্কুলে ভর্তি হলেও দুষ্টুমি করার কারণে তাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর থেকে বাড়িতেই মায়ের কাছে লেখাপড়া করতেন তিনি। তবে খুব অল্প বয়সে মায়ের মৃত্যুতে তার গৃহশিক্ষাও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। তার বয়স যখন ১২ বছর তখন তিনি একবার ইঞ্জিনচালিত গাড়িতে করে শহরে গিয়েছিলেন। এটা ছিল তার ছোটবেলার সবচেয়ে বড় কোনো ঘটনার মধ্যে একটি। কারণ এর আগ পর্যন্ত তিনি শুধুমাত্র ঘোড়ার গাড়ির সাথেই পরিচিত ছিলেন। ফলে ইঞ্জিনচালিত গাড়ির প্রতিটি কাজকর্মই তার কাছে ছিল এক অপার বিস্ময়৷ কৌতুহলের আতিশয্যে তিনি গাড়ি চালককে জিজ্ঞেস করে বসলেন কিভাবে এই ইঞ্জিন কাজ করে। গাড়ি চালকও সহাস্যে বর্ণনা করলেন সবকিছু। এগুলো দেখে তিনি ইঞ্জিনের প্রতি এতটাই আকর্ষণ অনুভব করেন যে তখন থেকে স্বীদ্ধান্ত নেন তিনি নিজেই এরকম একটি মডেল তৈরি করবেন। তার আরেকটি আকর্ষণের বিষয় ছিল ঘড়ি সারানো।

ফোর্ডের ছোটবেলায় তার বাবা তাকে একটি পকেট ঘড়ি দিয়েছিলেন। তার বয়স যখন ১৫ বছর তখন তিনি নিজে নিজেই ঘড়িটি বার বার নষ্ট করে আবার তা মেরামত করতেন। এটি ছিল ফোর্ডের কাছে এক ধরণের খেলা। ঘড়ি মেরামত করতে জানার কারণে তাদের এলাকায় কারো ঘড়ি নষ্ট হয়েই ডাক পড়ত হেনরি ফোর্ডের। খুব সহজেই ফোর্ড ঘড়ির যে কোনো ধরনের যান্ত্রিক সমস্যা সমাধান করতে পারতেন। এভাবে কলকব্জা, যন্ত্রপাতি নিয়ে সার্বক্ষণিক নাড়াচাড়া করতে করতে তিনি যন্ত্রপাতির এমন কিছু ব্যবহারিক কলাকৌশল শিখলেন যা আদৌ বই পড়ে জানা সম্ভব নয়। তিনি যন্ত্রপাতি থেকে শুধু জ্ঞান আহরণই করতো না, সম্ভব হলে সেটা ব্যবহারও করতেন। তার বাবা তাকে বলতো খামারে কাজ করতে। কিন্তু তিনি খামারে কাজ না করে মেশিনারি নিয়ে কোনোকিছু করার চিন্তা করতেন। তবে তার বাবা কখনোই মনে প্রাণে চাইতেন না যে হেনরি মেকানিক হোক।

ছোটবেলাতেই ফোর্ডের মা-বাবা মারা গেলে তিনি তার এক প্রতিবেশীর কাছে বসবাস শুরু করেন। এ সময় জীবিকার তাগিদে তাকে খামারে কাজ করতে হতো। কিন্তু যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করা যার নেশা সে কি আর খামারে পড়ে থাকতে পারে? পারে না। হেনরি ফোর্ড ও পারলেন না। তাইতো ১৭ বছর বয়সে ড্রাইডক ইঞ্জিন ওয়ার্কস এর মেশিন শপ-এ শিক্ষানবিশ হিসেবে যোগ দেন ফোর্ড। এ সময় সূক্ষ্ম কাজের প্রতি তার আগ্রহ এবং গাড়ি সম্পর্কে জ্ঞান থাকায় রাতে জুয়েলারি শপে রিপিয়ারিং এর কাজ করতেন তিনি। তবে কঠিন কোনো কাজ ছাড়া সাধারণত ঘড়ি কিংবা গহনা তৈরীর কাজ তিনি পছন্দ করতেন না। এক পর্যায়ে সফলতার সাথে তার শিক্ষানবিশ জীবনের ইতি ঘটলে তিনি ওয়েস্টিং হাউস কোম্পনী অব স্ক্যানেকট্যাডি এর স্থানীয় একজন প্রতিনিধির সঙ্গে ঐ কোম্পানির রোড ইঞ্জিন সংযোজন এবং মেরামত বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ শুরু করেন। পাশাপাশি ডেট্রয়েট এর গোল্ডস্মিথ, ব্রায়ান্ট এন্ড স্ট্রেটন বিজনেস কলেজে বুক কিপিং এর উপরও পড়াশোনা করেন হেনরি ফোর্ড।

১৮৯১ সালে এডিশন ইলুমিনেটিং কোম্পানির একজন প্রকৌশলী হিসেবে নিযুক্ত হন ফোর্ড। এখান থেকে তিনি ১৯৯৩ সালে প্রধান প্রকৌশলী হিসাবে পদোন্নতি লাভ করেন। এর ফলে গ্যাসোলিন ইঞ্জিনের উপর ব্যক্তিগত গবেষণায় মনোনিবেশ করার জন্য যথেষ্ট সময় এবং অর্থ লাভ করেন তিনি। প্রায় তিন বছর পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ফোর্ড একটি গাড়ি তৈরী করেন যার নাম দেন ফোর্ড কোয়াড্রিসাইকেল। বেশ কয়েক বার পরীক্ষামূলক চালনার পর তিনি চিন্তা করতে থাকেন কিভাবে কোয়াড্রি সাইকেলটিকে আরো উন্নত করা যায়। ঠিক এই সময় দি এডিসন কোম্পানি থেকে প্রস্তাব আসে যে তারা হেনরি ফোর্ডকে একটি শর্ত সাপেক্ষে কোম্পানির জেনারেল সুপারিন্টেন্ডেন্সি দিতে রাজি আছে। আর শর্তটি হলো তাকে গ্যাস ইঞ্জিনের উপর পরীক্ষা নিরীক্ষা বন্ধ করে দিতে হবে। চরম এক সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হন ফোর্ড। একদিকে কোম্পানিতে উঁচু বেতনের সম্মানজনক পদ অন্যদিকে তার ভালোবাসার জায়গা, গাড়ি নিয়ে গবেষণার এক অনিশ্চিত পথযাত্রা। অবশেষে জয় হলো ভালোবাসার, তিনি তার মটরগাড়ি উন্নয়নের কাজকে প্রাধান্য দিয়ে চাকরি ছেড়ে দিলেন। তার এই সিদ্ধান্ত একেবারে অবিবেচনাপ্রসূত কিংবা নিছক খামখেয়ালের বশে ছিল না।

কারণ তিনি ইতোমধ্যেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন তার গাড়ি সফল হতে বাধ্য। তাই পূর্ণ উদ্দীপনার সাথে মোটরগাড়ি উন্নয়ন নিয়ে কাজ শুরু করে দেন ফোর্ড। তবে এই সময়টা তার পক্ষে একদমই সহজ ছিল না। এর একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে হেনরি ফোর্ডের নিজস্ব কোনো তহবিল না থাকা। জীবিকা নির্বাহের পর যা কিছু অর্থসম্পদ অবশিষ্ট ছিল তাও ব্যয় হয়ে যায় পরীক্ষা নিরীক্ষার কাজে। তাছাড়া সে সময় ব্যক্তিগত গাড়ির কোনো চাহিদাও ছিল না। এটাকে তখন সবাই চরম বিলাসিতার পণ্য হিসাবে বিবেচনা করত। এমনকি কোনো বিত্তবানও এর ব্যবসায়িক সম্ভাবনার কথা চিন্তা করতে পারেনি। এরকম লোক বলতে গেলে খুঁজেই পাওয়া যেত না যারা বুঝতে পারতো যে গাড়ি অনেক বড় একটি শিল্পখাত তৈরী করতে পারে। এরপর একটা সময় মানুষ যখন দেখলো যে একাধিক প্রস্তুতকারক গাড়ি তৈরী করছে তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রথম প্রশ্নটি ছিল কোনটি দ্রুত চলবে। এভাবে জন্ম নেয় গাড়িদৌড় বা কাররেসিং প্রতিযোগীতা। মূলত হেনরি ফোর্ড রেসিং-এর কথা চিন্তা নাকরে বরং ব্যক্তিগত ব্যবহারপযোগী গাড়ি তৈরির কথা ভাবতেন। কিন্তু তখনকার মানুষের কাছে এটা গ্রহণযোগ্যতা পায় নি।

এই আর্টিকেলের বাকি অংশ পড়ুনঃ https://millionairex101.com/successful-people/%e0%a6%8f%e0%a6%95%e0%a6%9c%e0%a6%a8-%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%a8%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%9c-%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%81%e0%a6%b7%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%ac-2/

তথ্যসূত্রঃ মোঃ শফিকুল ইসলামের বই “অগ্রযাত্রী” থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। 

 

2 thoughts on “একজন স্বপ্নবাজ মানুষের বিশ্বসেরা ফোর্ড কোম্পানি প্রতিষ্ঠার গল্প!”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *